পুরান ঢাকার অলিতে-গলিতে বাকরখানির গল্প
রাজধানীর ভোরের পুরান ঢাকা যেন এক অন্যরকম স্মৃতির নাম। সরু অলি–গলিতে ঢুকতেই নাকে ভেসে আসে হাসনাহেনা ফুলের ঘ্রাণের মতো ঘি আর ময়দার মিশ্র সুবাস। চিকন রাস্তার দুই পাশে ঘেঁষে থাকা ছোট ছোট দোকানগুলোতে কাঠের চুলার ওপর বড় তাওয়ায় সেঁকা হচ্ছে গোলাকার শক্ত রুটি—বাকরখানি।
সময়ের পরিবর্তন, আধুনিক বেকারির বিস্তার এবং কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির মধ্যেও পুরান ঢাকার কিছু দোকান এখনো ধরে রেখেছে এই ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ ও সংস্কৃতি। শুধু একটি খাবার নয়, বাকরখানি যেন প্রায় ৪০০ বছরের পুরান ঢাকার ইতিহাসের এক জীবন্ত স্মৃতি।
বাকরখানির ইতিহাস ও ঐতিহ্য
বাকরখানির জন্ম মূলত মুঘল আমলে। অনেকে মনে করেন, বাংলার নবাবি আমলে প্রথম নবাব মুর্শিদ কুলি খানের সময় থেকেই এর নামকরণের গল্প শুরু হয়। মুর্শিদ কুলি খানের পালকপুত্র মির্জা আগা বাকের খানের প্রেমকাহিনী থেকেই ‘বাকরখানি’ নামের উদ্ভব।
পারস্য থেকে আগত আগা বাকের খান ছিলেন নবাবের সেনাপতি। ঢাকার আরামবাগের নবাবদের দরবারে কর্মরত এক গুণবতী ও রূপবতী নৃত্যশিল্পী ‘খানি’-র সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে। খানি ছিলেন চমৎকার কণ্ঠ ও নৃত্যগুণের অধিকারী। এক নৃত্য অনুষ্ঠানে বাকের খাঁ তার প্রেমে পড়েন। তবে তাদের এই প্রেমের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ান ‘জয়নুল’ নামে এক স্থানীয় ব্যক্তি। প্রেমের খবর জানতে পেরে জয়নুল খানিকে অপহরণ করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে বাকের খাঁ জয়নুলকে হত্যা করতে উদ্যত হন। পরে গুজব রটে, বাকের খাঁ-ই জয়নুলকে হত্যা করেছেন। এই অভিযোগে নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁ তার পুত্রকে মৃত্যুদণ্ড দেন এবং বাঘের খাঁচায় বন্দি রাখেন। বাঘের খাঁচায় বন্দি অবস্থায় প্রিয়তমা খানির কথা মনে করে বাকের খাঁ একটি বিশেষ রুটি তৈরি করেন, যা আজকের ‘বাকরখানি’। বর্তমানে এটি শুধু পুরান ঢাকার খাদ্যসংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে পরিচিত নয়, বরং সারা বাংলাদেশের যেকোনো জায়গায় এক ঐতিহাসিক স্মৃতির নাম।
যেভাবে বাকরখানি তৈরি করা হয়
বাকরখানি তৈরি সহজ নয়। প্রথমত, শুরু হয় ময়দার খামির দিয়ে। ময়দার সঙ্গে পরিমাণমতো লবণ, ঘি, দুধ, চিনি ও তেল মিশিয়ে খামির তৈরি করা হয়। এরপর একাধিক স্তর ভাঁজ দিয়ে রুটির গঠন তৈরি করা হয়। কাঠের চুলায় ধীরে ধীরে সেঁকে তোলা হয়, যাতে বাইরেটা খাস্তা আর ভেতরটা হালকা নরম থাকে। অনেক সময় স্বাদে বৈচিত্র্য আনতে এতে দারুচিনি, এলাচ ও কালোজিরার মতো মসলা যোগ করা হয়।
বাকরখানির বিভিন্ন দাম ও ধরণ
বর্তমানে পুরান ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের ও স্বাদের বাকরখানি পাওয়া যায়। স্বাদভেদে বাকরখানির দামের পার্থক্য হয়। যেমন পনির মিশ্রিত বাকরখানি প্রতি কেজি ৩০০ টাকা দরে বিক্রি করা হয়ে থাকে, যেখানে এক কেজিতে সাধারণত ২০ থেকে ২২টি বাকরখানি থাকে। তিলের বাকরখানির দামও প্রতি কেজি ৩০০ টাকা। মিষ্টি মিশ্রিত বাকরখানি প্রতি কেজি ২০০ টাকা। ছোট আকারের মিষ্টি বাকরখানির দামও কেজি প্রতি ২০০ টাকা। এছাড়াও নোনতা বাকরখানি প্রতি কেজির দাম রাখা হয় ১৮০–২০০ টাকা, যা ডায়াবেটিকস রোগীদের জন্য উপযুক্ত।
একজন বাকরখানি ব্যবসায়ী বলেন, ‘বাকরখানি বিভিন্নভাবে খাওয়া যায়—চা থেকে শুরু করে তরকারি, বিভিন্ন ধরনের মাংস, দুধ ও মিষ্টির সঙ্গে। অনেক সময় ডায়াবেটিকস রোগীসহ বিভিন্ন রোগীরাও বাকরখানি খেয়ে থাকেন। তিনি বলেন, বর্তমানে অনেক খাবারে বিভিন্ন ধরনের মেডিসিন মেশানো থাকে, যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। কিন্তু বাকরখানিতে কোনো ভেজাল নেই। আর ভেজাল থাকলেও আগুনে পুড়ে তা নষ্ট হয়ে যায়।”
বিশেষ করে যারা গ্রাম থেকে পড়াশোনার উদ্দেশ্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ ঢাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করতে আসেন, তাদের কাছে বাকরখানি শুধু খাবার নয়, এক ধরনের আবেগ। ছুটিতে বা সুযোগ পেলেই বাড়ি ফেরার সময় অনেক শিক্ষার্থী পুরান ঢাকা থেকে বাকরখানি কিনে নিয়ে যান।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বলেন, “ঢাকার অনেক কিছু বাড়িতে নেওয়া যায় না, কিন্তু বাকরখানি নিলে মনে হয় পুরান ঢাকার একটা অংশই সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছি। বাড়িতে সবাই একসঙ্গে বসে খেলে ঢাকার কথা, পড়াশোনার গল্প—সবকিছু নতুন করে মনে পড়ে।” গ্রামে ফিরে পরিবারের সঙ্গে বসে বাকরখানি খাওয়ার সেই মুহূর্ত শিক্ষার্থীদের কাছে হয়ে ওঠে শহর ও গ্রামের মধ্যে এক অনুভূতির সেতুবন্ধন। রাজধানীর ব্যস্ততা আর গ্রামের শান্ত জীবনের মাঝখানে এই ঐতিহ্যবাহী খাবার তাদের স্মৃতি ও আবেগে মন ভরে রাখে।”
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী আতিকুর রহমান আতিক বলেন, “পুরান ঢাকায় এসেই আমি বাকরখানির সাথে পরিচিত হই। এটা অত্যন্ত সুন্দর এবং মজাদার খাবার। এখন একবার খেলে আরেকবার খেতে মন চায়। “








