হালদা নদীতে ‘নমুনা ডিম’ ছাড়ল মা মাছ, বড় প্রজননের আশায় অপেক্ষায় সংগ্রহকারীরা
নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রামঃ
দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীতে চলতি মৌসুমের শুরুতেই মা মাছের ‘নমুনা ডিম’ ছাড়ার ঘটনা দেখা গেছে। মৌসুমের একেবারে শুরুতেই এই ডিম পাওয়া যাওয়াকে বড় পরিসরে ডিম ছাড়ার আগাম বার্তা হিসেবে দেখছেন গবেষক ও মৎস্য কর্মকর্তারা। ফলে নদীর দুই পাড়ে অবস্থান নেওয়া শত শত ডিম সংগ্রহকারীর মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) সকাল ৭টার দিকে ভাটার সময় এবং দুপুরে জোয়ারের সময় নয়াহাট, আজিমের ঘাট ও নাপিতের ঘাটসহ নদীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে এই নমুনা ডিম পাওয়া যায়। স্থানীয় সংগ্রহকারীরা জানান, সকালবেলায় অনেকেই ১০০ থেকে ২০০ গ্রাম পর্যন্ত ডিম সংগ্রহ করেছেন। আবার দুপুরের জোয়ারে কয়েকজন এক থেকে দেড় কেজি পর্যন্ত ডিম সংগ্রহ করতে সক্ষম হন।
রাউজান ও হাটহাজারী উপজেলা মৎস্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, নদীর অন্তত তিন থেকে চারটি স্থানে এই নমুনা ডিম পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এটি স্পষ্ট ইঙ্গিত যে পরিবেশ অনুকূলে থাকলে যেকোনো সময় মা মাছ পূর্ণমাত্রায় ডিম ছাড়তে পারে।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত চার মাস হালদা নদীতে কার্পজাতীয় মাছ—রুই, কাতলা, মৃগেল ও কালবাউশ—প্রজনন করে। সাধারণত বজ্রসহ বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানির সঙ্গে মিলেই মা মাছ ডিম ছাড়ে। এ সময় নদীর দুই পাড়ে ৫০০ থেকে ৭০০ জন পর্যন্ত সংগ্রহকারী জাল ও নৌকা নিয়ে প্রস্তুত থাকেন। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডিমের পরিমাণ কমে যাওয়ায় সংগ্রহকারীর সংখ্যাও কিছুটা কমেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, হাটহাজারী ও রাউজান উপজেলায় চারটি সরকারি হ্যাচারি এবং শতাধিক মাটির কুয়ায় রেণু উৎপাদনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। ডিম সংগ্রহকারীরা জাল, নৌকা ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে নদীর তীরে অবস্থান করছেন।
আজিমের ঘাট এলাকার সংগ্রহকারী রোশাঙ্গীর আলম জানান, দুপুরের জোয়ারে তিনি এক থেকে দেড় কেজি ডিম সংগ্রহ করেছেন এবং সামনে আরও বেশি ডিম পাওয়ার আশায় রয়েছেন। একইভাবে গড়দোয়াড়া এলাকার প্রবীণ সংগ্রহকারী কামাল উদ্দিন সওদাগর বলেন, এখনো ডিমের পরিমাণ কম হলেও সবাই মূল ডিম ছাড়ার অপেক্ষায় আছেন।
হালদা নদী নিয়ে গবেষণাকারীরা বলছেন, পূর্ণ ডিম ছাড়ার আগে মা মাছ অল্প পরিমাণ ডিম ছাড়ে, যাকে ‘নমুনা ডিম’ বলা হয়। এটি মূলত জোয়ার-ভাটার চাপ, বজ্রপাত বা পরিবেশগত পরিবর্তনের প্রভাবে ঘটে থাকে। এই নমুনা ডিমই বড় প্রজননের পূর্বাভাস হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়-এর হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির সমন্বয়ক অধ্যাপক মো. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, নদীতে এখন ডিম ছাড়ার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সামনের জোয়ারে বড় আকারে ডিম ছাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
স্থানীয় ডিম সংগ্রহকারী মুন্না চৌধুরী জানান, সকাল থেকে তারা অল্প অল্প করে নমুনা ডিম পাচ্ছেন। তবে হঠাৎ বড় আকারে ডিম ছাড়লে প্রস্তুতির অভাবে তা সংগ্রহ করা কঠিন হতে পারে বলে তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন।
হালদাপাড়ের বাসিন্দা আশীষ জলদাস বলেন, ‘আমরা সবাই প্রস্তুত আছি। নিয়ম অনুযায়ী প্রথমে নমুনা ডিম, এরপর মূল ডিম ছাড়বে। তখন শুরু হবে আমাদের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়।’
সংশ্লিষ্টদের মতে, চৈত্র থেকে আষাঢ় মাসের অমাবস্যা বা পূর্ণিমার সময়, বিশেষ করে বজ্রসহ ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের মধ্যে ডিম ছাড়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে। তাই আগামী জুন মাসের অমাবস্যা ও পূর্ণিমার জোয়ারকে এই মৌসুমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে হালদা নদী থেকে প্রায় ১৪ হাজার কেজি নিষিক্ত ডিম সংগ্রহ করা হয়েছে। ২০২৪ সালে এই পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৬৬০ কেজি। এর আগে ২০২৩ সালে প্রায় ১৪ হাজার ৬৬৪ কেজি, ২০২২ সালে ৭ হাজার ২০০ কেজি এবং ২০২১ সালে ৮ হাজার ৫০০ কেজি ডিম সংগ্রহ করা হয়। তবে ২০২০ সালে সর্বোচ্চ প্রায় সাড়ে ২৫ হাজার কেজি ডিম সংগ্রহ হয়েছিল, যা গত ১৬ বছরের মধ্যে রেকর্ড।
মৌসুমের শুরুতেই নমুনা ডিম পাওয়ায় এবারও ভালো উৎপাদনের আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে সবকিছুই নির্ভর করছে প্রকৃতির অনুকূল পরিবেশের ওপর।





