আনন্দের সফর শেষ হলো কান্নায়, ইনানীর আগুনে স্বজনদের খুঁজে ফিরছেন আশিকুল
একসঙ্গে ঘুরতে এসেছিলেন, স্বপ্ন ছিল আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফেরার। কিন্তু কে জানত, সেই ভ্রমণই কেড়ে নেবে জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষগুলোকে হারানোর ভয়াবহ অভিজ্ঞতা! কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানী পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকার একটি রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর স্ত্রীসহ পরিবারের ছয় সদস্য নিখোঁজ থাকায় শোকে পাথর হয়ে গেছেন আশিকুল ইসলাম। কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গের সামনে বসে বুক চাপড়ে কাঁদছেন তিনি। বারবার বলছেন, ‘আর ১০টা মিনিট সময় পেলে আমার স্ত্রীও নিচে নেমে আসতে পারত।’
আশিকুলের এই আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে হাসপাতাল এলাকার পরিবেশ। প্রিয় মানুষগুলোকে হারানোর আশঙ্কায় তাঁর চোখেমুখে শুধুই অসহায়ত্ব। যে স্ত্রী তাঁকে আগুনের খবর দিয়ে ঘুম থেকে জাগিয়েছিলেন, সেই স্ত্রীকেই আর খুঁজে পাচ্ছেন না তিনি।
গত বৃহস্পতিবার সকালে স্ত্রী ও শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়স্বজনদের নিয়ে ঢাকা থেকে কক্সবাজার বেড়াতে এসেছিলেন আশিকুল। তাঁদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল উখিয়ার ইনানী পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকার ‘টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে’। শনিবার তাঁদের ঢাকায় ফেরার কথা ছিল। কিন্তু বাড়ি ফেরার আগেই ভয়াবহ আগুন সব আনন্দ কেড়ে নেয়। আনন্দের ভ্রমণ পরিণত হয় দুঃস্বপ্নে।
আশিকুল ইসলাম জানান, রিসোর্টে আগুন দেখতে পেয়ে তাঁর স্ত্রী তাঁকে ঘুম থেকে ডেকে তোলেন। এরপর পাশের কক্ষে থাকা অন্য স্বজনদের ডাকতে যান তিনি। এরই মধ্যে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে আশিকুল একটি জানালা ভেঙে সেখান দিয়ে লাফিয়ে বেরিয়ে আসেন। কিন্তু তাঁর স্ত্রী আর বেরিয়ে আসতে পারেননি।
এক মুহূর্তের সেই বিচ্ছেদ যে এত বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করবে, তা কল্পনাও করেননি আশিকুল। এখন হাসপাতালের মর্গের সামনে বসে প্রিয়জনদের সন্ধানে তাঁর প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে কান্না আর উৎকণ্ঠায়।
পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, অগ্নিকাণ্ডের সময় রিসোর্টে তাঁদের পরিবারের মোট নয়জন সদস্য অবস্থান করছিলেন। তাঁদের মধ্যে আশিকুলের মামা-শ্বশুর মাসুদ ও তাঁর স্ত্রী মিলা দগ্ধ ও আহত হন। তাঁদের কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকেরা তাঁদের ঢাকায় পাঠানোর পরামর্শ দেন।
অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে আশিকুলের পরিবারের যে ছয় সদস্য নিখোঁজ রয়েছেন, তাঁরা হলেন—তাঁর স্ত্রী ইসরাত জাহান মালিহা, শ্যালিকা লায়লা জাহান নাবিলা, মিলিতা মেহজাবিন আলভি, ফারিহা কবির এবং পাঁচ বছর বয়সী দুই শিশু ফায়িজান আহমদ ও নাফিস তেহামি জেরিফ।
এদিকে শনিবার দুপুর ২টার দিকে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আ. মান্নান সদর হাসপাতালে আহত ব্যক্তিদের দেখতে যান। এ সময় আশিকুল তাঁর পরিবারের নিখোঁজ সদস্যদের পরিচয় জেলা প্রশাসককে জানান।
জেলা প্রশাসক জানান, নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিচয় সংগ্রহ করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর ডিএনএ নমুনা নেওয়া হচ্ছে। স্বজনদের ডিএনএ নমুনার সঙ্গে মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করার পর মরদেহ হস্তান্তর করা হবে।
এর আগে শনিবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে ইনানীর টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট সকাল ৮টা ১৫ মিনিটের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর পরিচয় শনাক্তের প্রক্রিয়া চলমান থাকায় নিখোঁজ ছয়জনের মধ্যে কেউ রয়েছেন কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
একটি পরিবারের কাছে সবচেয়ে বড় আশ্রয় তার প্রিয় মানুষগুলো। সেই মানুষগুলোকে হারানোর আশঙ্কায় আজ অসহায় আশিকুল। যে হাত ধরে বেড়াতে এসেছিলেন, সেই হাতটি আবার ধরতে পারবেন কি না, জানেন না তিনি। যে পরিবার নিয়ে ঘরে ফেরার কথা ছিল, সেই পরিবারের সদস্যদের খুঁজতে এখন হাসপাতালের মর্গের সামনে তাঁর দীর্ঘ অপেক্ষা।
কক্সবাজারের এই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ড শুধু একটি রিসোর্টের আগুনের ঘটনা নয়; এটি একটি পরিবারের আনন্দ, স্বপ্ন আর স্বাভাবিক জীবনে নেমে আসা গভীর অনিশ্চয়তার করুণ চিত্র।





