মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পরও চলেছে গুলি, আফতাব হত্যায় ১১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র
চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁওয়ে ইট-বালুর ব্যবসায়ী আফতাব উদ্দিনকে (২৭) গুলি করে হত্যার ঘটনায় প্রায় দুই বছর পর ১১ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। অভিযোগপত্রে উঠে এসেছে হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহ বিবরণ—গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পরও আফতাবকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। হত্যার পরও প্রায় ৮ থেকে ১০ মিনিট ফাঁকা গুলি ছুড়ে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করে পালিয়ে যান হামলাকারীরা। ২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর বিকেলে নগরের চান্দগাঁও থানার হাজীপাড়ায় ওমর ফারুকের চায়ের দোকানের সামনে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। পুলিশের অভিযোগপত্র ও সিসিটিভি ফুটেজের বিবরণ অনুযায়ী, সেদিন একটি কালো রঙের নোহা মাইক্রোবাস এসে থামে চায়ের দোকানের সামনে। পরে গাড়ি থেকে নেমে কয়েকজন যুবক ব্যাগ থেকে অস্ত্র বের করে সেখানে বসে থাকা আফতাবকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন।
নিহত আফতাব হাজীপাড়া এলাকার মো. মুসার ছেলে। তাঁর পরিবারের দাবি, ইট-বালুর ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধের জেরে তাঁকে হত্যা করা হয়।পুলিশের অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর বিকেল ৪টা ৩১ মিনিটে কালো রঙের নোহা মাইক্রোবাসটি হাজীপাড়ায় চায়ের দোকানের সামনে এসে থামে। ওই সময় সড়কে রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল করছিল। আশপাশের দোকান ও বাড়িঘরেও লোকজন ছিলেন।কিছুক্ষণ পর মাইক্রোবাস থেকে পাঁচ-ছয়জন যুবক নেমে কাঁধের ব্যাগ থেকে অস্ত্র বের করেন। এরপর দোকানের সামনে বসে থাকা আফতাবকে লক্ষ্য করে গুলি চালান তাঁরা। গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে পড়ে যাওয়ার পরও তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আফতাবের ঊরু ও পায়ে পরপর চারটি গুলি লাগে। প্রকাশ্যে এভাবে গুলি চালানোর ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। লোকজন ছোটাছুটি শুরু করেন এবং আশপাশের সড়কে চলাচল ব্যাহত হয়।অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, আফতাবের মৃত্যু নিশ্চিত করার পরও হামলাকারীরা ফাঁকা গুলি ছুড়তে থাকেন। প্রায় ৮ থেকে ১০ মিনিট ধরে গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে তাঁরা মাইক্রোবাসে উঠে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।ঘটনার একজন প্রত্যক্ষদর্শী ও সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করা স্থানীয় এক দোকানদারের ভাষ্য, হামলাকারীদের হাতে অস্ত্র দেখে এবং গুলির শব্দ শুনে ভয়ে কেউ এগিয়ে আসেননি। যাতে কেউ তাঁদের ধাওয়া করতে সাহস না পান, সে জন্য পালানোর সময়ও ফাঁকা গুলি ছোড়া হয়।
চান্দগাঁও থানা-পুলিশের দাখিল করা অভিযোগপত্রে বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত সাজ্জাদ আলীর অনুসারী মো. সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ, মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমন, বোরহান উদ্দিনসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়েছে।অন্য আসামিরা হলেন মো. হাসান, মোহাম্মদ ওরফে ভাতিজা মোহাম্মদ, খোরশেদ আলম চৌধুরী, মো. হেলাল, ইলিয়াস হোসেন, মো. এমরান, শিহাব উদ্দিন ও সাইফুল ইসলাম।পুলিশের তদন্তে বলা হয়েছে, ইট-বালুর ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে পূর্বপরিকল্পিত ভাবে আফতাবকে হত্যা করা হয়। আসামিদের মধ্যে বোরহান উদ্দিন ও মোহাম্মদ জামিনে রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য আসামিদের কারাগারে থাকার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
আফতাবের পরিবারের সদস্যদের দাবি, সাজ্জাদের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লেখালেখি করতেন আফতাব। ইট-বালুর ব্যবসা পরিচালনা করতে গিয়েও তাঁর কাছে চাঁদা দাবি করা হতো। এ নিয়ে হত্যাকাণ্ডের প্রায় দুই মাস আগে তাঁরা আদালতে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।তবে এ বিষয়ে পুলিশ কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ করেছেন পরিবারের সদস্যরা।পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পর তাঁর দলের নেতৃত্ব দেন ডেভিড ইমন। সাজ্জাদের নির্দেশে মুঠোফোনে চাঁদা চেয়ে হুমকি দেওয়া হতো বলে তদন্তে উঠে এসেছে। চাঁদা না পেলে নির্মাণাধীন ভবন ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গুলি চালানোর অভিযোগও রয়েছে। চাঁদার টাকা হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাঠানো হতো বলেও তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে সাজ্জাদ আলী হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে কিছু জানেন না বলে দাবি করেছেন। তাঁর এক আত্মীয়কেও ষড়যন্ত্রমূলক ভাবে মামলায় ফাঁসানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থল থেকে শটগানের কার্তুজ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে সেগুলোর ব্যালিস্টিক পরীক্ষা করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। পরীক্ষায় কার্তুজগুলো ১২ বোরের শটগানের বলে মত দেন সিআইডির চট্টগ্রামের ব্যালিস্টিক বিশেষজ্ঞ শাকেরুল আলম।এ মামলায় ছোট সাজ্জাদ ও ডেভিড ইমনসহ গ্রেপ্তার আসামিদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে চান্দগাঁও থানা-পুলিশ। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজে আসামিদের অস্ত্র হাতে দেখা গেলেও হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত কোনো অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদেও আসামিরা অস্ত্রের বিষয়ে তথ্য দেননি বলে জানিয়েছেন সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা চান্দগাঁও থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শরিফুল ইসলাম।
মামলাটির তদন্তে পর্যায়ক্রমে চারজন এসআই দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা জানান, এজাহারের বাইরে তদন্তে যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদেরও অভিযোগপত্রে আসামি করা হয়েছে।ছেলের হত্যাকাণ্ডের তদন্তে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আফতাবের বাবা মো. মুসা। তিনি নগরের জুবিলী রোড এলাকার একটি দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন। তাঁর অভিযোগ, বারবার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত কোনো অস্ত্র উদ্ধার করা যায়নি।বিচার পাওয়া নিয়ে হতাশা প্রকাশ করলেও নিরাপত্তার আশঙ্কায় এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে রাজি হননি তিনি।চট্টগ্রাম নগরের জনবহুল এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার এ ঘটনা এলাকাবাসীর নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং উদ্ধার হওয়া কার্তুজ তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলেও হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া এবং তদন্তে দীর্ঘ সময় লাগা মামলাটিকে আরও আলোচনায় এনেছে।
এখন আফতাবের পরিবারের প্রত্যাশা, আদালতে মামলার বিচারিক কার্যক্রমের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটিত হবে এবং দায়ীদের আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত হবে।





