জঙ্গল সলিমপুরে ফের মাথাচাড়া দিচ্ছে ‘ইয়াছিন বাহিনী’—হুমকি, চাঁদাবাজি ও পাহাড় দখলের আশঙ্কা
নিজস্ব প্রদিবেদকঃ
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার আলোচিত জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর বড় অভিযানের পর কিছুদিন শান্ত থাকার পর আবারও সক্রিয় হয়ে উঠছে শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াছিনের নেতৃত্বাধীন ‘ইয়াছিন বাহিনী’। স্থানীয়দের অভিযোগ, পাহাড়ি এই জনপদে ফের আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে চক্রটি।
গত ৯ মার্চ পরিচালিত ব্যাপক যৌথ অভিযানে এলাকা থেকে সন্ত্রাসীদের উৎখাত করে প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি করলেও কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে পরিস্থিতি আবারও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। ওই অভিযানে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার সদস্য অংশ নেয় এবং ১০ ঘণ্টাব্যাপী অভিযানের পর জঙ্গল সলিমপুরে দুটি স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়।
পাহাড়ে ঘাঁটি, গোপনে তৎপরতা
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, অভিযানের সময় ইয়াছিন বাহিনীর অন্তত দেড় শতাধিক সদস্য এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। প্রথমে তারা নগরের আকবরশাহ থানা এলাকার শাপলা আবাসিক, ১ নম্বর ঝিল, বেলতলীঘোনা ও নাছিয়াঘোনা এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বাড়লে তারা আবার জঙ্গল সলিমপুরের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল—নবীনগর ও চাকমাপাড়ায় আশ্রয় নেয়।
বর্তমানে সেখান থেকেই তারা পুনরায় সংগঠিত হয়ে জঙ্গল সলিমপুরের ছিন্নমূল এলাকাগুলো নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
হুমকি-ধমকি ও চাঁদাবাজির অভিযোগ
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ইয়াছিন বাহিনীর সদস্যরা পলাতক থাকলেও নিয়মিত মোবাইল ফোনে হুমকি দিচ্ছে। এলাকায় গরু-ছাগল চুরি, চাঁদা আদায় এবং বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের চেষ্টা চলছে। বিশেষ করে দরিদ্র ছিন্নমূল মানুষেরাই তাদের প্রধান টার্গেট।
এছাড়া বিদ্যুৎ ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ছিন্নমূল এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ ও মিটার ব্যবস্থাপনা এখনো সন্ত্রাসীদের প্রভাবমুক্ত হয়নি।
পুলিশের বিরুদ্ধে ‘যোগসাজশ’ অভিযোগ
চট্টগ্রাম মহানগর বস্তিবাসী সমন্বয় সংগ্রাম পরিষদ অভিযোগ করেছে, প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পরও রহস্যজনকভাবে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ইয়াছিন চক্রের লোকজনের হাতেই রয়েছে। এমনকি পুলিশের কিছু অসাধু সদস্য সন্ত্রাসীদের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ রেখে তথ্য আদান-প্রদান করছে বলেও অভিযোগ তোলা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে পুলিশ। ফৌজদারহাট পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ সোহেল রানা বলেন, “এলাকায় সেবা স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসন কাজ করছে। একটি স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য হারিয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।”
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থান
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (পশ্চিম) মো. আলমগীর হোসেন জানিয়েছেন, জঙ্গল সলিমপুর ও আশপাশের এলাকায় এখনো কড়া নজরদারি রয়েছে। শাপলা আবাসিক এলাকায় পুলিশ ক্যাম্প এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “সন্ত্রাসীদের পুনরায় সংগঠিত হওয়ার সুযোগ নেই। অনেককে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, বাকিদের ধরতে অভিযান চলছে।”
কে এই ইয়াছিন
জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর ও ছিন্নমূল এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করে আসছে মো. ইয়াছিন। তার বিরুদ্ধে সরকারি পাহাড় দখল, পাহাড় কেটে প্লট তৈরি ও বিক্রি, চাঁদাবাজি এবং সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী পরিচালনার একাধিক অভিযোগ রয়েছে।
গত ১৯ জানুয়ারি র্যাব কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া হত্যা মামলার প্রধান আসামিও এই ইয়াছিন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তালিকায় তিনি শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত।
আতঙ্কে সাধারণ মানুষ
যৌথ বাহিনীর অভিযানের পর কিছুদিন স্বস্তি ফিরলেও নতুন করে সন্ত্রাসীদের তৎপরতার অভিযোগে আবারও ভীত হয়ে পড়েছে জঙ্গল সলিমপুরের বাসিন্দারা। তারা দ্রুত ইয়াছিনসহ তার বাহিনীর সদস্যদের গ্রেপ্তার করে স্থায়ীভাবে এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।





